বাংলাদেশের স্মার্টফোন বাজার প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি, ভোক্তার পরিবর্তিত চাহিদা, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তারের মধ্যে একটি মোবাইল ব্র্যান্ডের সাফল্য এখন আর শুধু পণ্যের বৈশিষ্ট্য বা দামের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্রাহকের আস্থা, ব্র্যান্ডের স্বতন্ত্র পরিচিতি, কার্যকর বিপণন কৌশল এবং মানুষের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলার সক্ষমতা। এই পরিবর্তনশীল শিল্পে কাজ করছেন ইফতেখার উদ্দিন সানী, যিনি বর্তমানে ইনফিনিক্স মোবাইল ব্র্যান্ডের সিনিয়র ব্র্যান্ড ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর পেশাগত অভিজ্ঞতার পরিধিতে রয়েছে মোবাইল ফোন শিল্প, টেলিযোগাযোগ, করপোরেট সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা, ব্র্যান্ডিং, বিপণন এবং জনসংযোগ।
এর আগে তিনি জেটিসি গ্রুপ অব কোম্পানিজের কান্ট্রি হেড অব মার্কেটিং, লয়াল আরবিট্রেশনের ব্র্যান্ডিং, মার্কেটিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন হেড, বাংলালিংক ও এয়ারটেল বাংলাদেশের করপোরেট রিলেশনশিপ ম্যানেজার এবং অপো মোবাইল ব্র্যান্ডের কান্ট্রি মার্কেটিং, পাবলিক রিলেশন ও কমিউনিকেশন ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেছেন। বিভিন্ন খাতের এই অভিজ্ঞতা তাঁকে ব্র্যান্ড ব্যবস্থাপনার একাধিক দিক নিয়ে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। টেলিকম খাতের করপোরেট যোগাযোগ থেকে স্মার্টফোনের বাজারে ব্র্যান্ডের অবস্থান তৈরি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে গ্রাহককে বোঝা, সঠিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা। ইফতেখার উদ্দিন সানীর পেশাগত যাত্রা, বাংলাদেশের স্মার্টফোন বাজারের বর্তমান বাস্তবতা, ব্র্যান্ডিংয়ের নতুন ধারা এবং ভবিষ্যৎ বিপণন কৌশল নিয়ে থাকছে এই বিশেষ সাক্ষাৎকার।
প্রশ্ন: আপনার পেশাগত জীবনের যাত্রা শুরু থেকে বর্তমান অবস্থান পর্যন্ত কীভাবে এগিয়েছে?
ইফতেখার উদ্দিন সানী: আমার পেশাগত জীবনের যাত্রাটা মূলত শেখা, অভিজ্ঞতা অর্জন এবং নিজেকে প্রতিনিয়ত নতুনভাবে তৈরি করার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে আমি টেলিকমিউনিকেশন, করপোরেট রিলেশনশিপ, ব্র্যান্ডিং, মার্কেটিং, জনসংযোগ ও কমিউনিকেশন নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। প্রতিটি অভিজ্ঞতা আমার পেশাগত দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে সমৃদ্ধ করেছে। বর্তমানে ইনফিনিক্স মোবাইল ব্র্যান্ডের সিনিয়র ব্র্যান্ড ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছি। আমার কাছে এই দায়িত্ব শুধু একটি ব্র্যান্ডকে মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভোক্তার চাহিদা বোঝা, প্রযুক্তির সুবিধাগুলো কার্যকরভাবে তুলে ধরা এবং গ্রাহকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমি বিশ্বাস করি, ক্যারিয়ারে প্রতিটি অভিজ্ঞতাই নতুন কিছু শেখার সুযোগ তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি, বাজার ও মানুষের প্রত্যাশা বদলায়। তাই একজন মার্কেটিং পেশাজীবীর জন্য শেখার মানসিকতা, সৃজনশীল চিন্তা, অভিযোজনক্ষমতা এবং মানুষের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার পেশাগত যাত্রায় অর্জিত অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতেও ব্র্যান্ড ও ভোক্তার মধ্যে আরও অর্থবহ সম্পর্ক তৈরিতে অবদান রাখতে চাই।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের স্মার্টফোন বাজারে প্রতিযোগিতা দিন দিন বাড়ছে। এই বাজারে একটি ব্র্যান্ডকে স্বতন্ত্র অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করার মূল কৌশল কী?
ইফতেখার উদ্দিন সানী: আমার মতে, বাংলাদেশের মতো প্রতিযোগিতাপূর্ণ স্মার্টফোন বাজারে একটি ব্র্যান্ডকে স্বতন্ত্র অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে প্রথমেই ভোক্তার চাহিদা, পছন্দ ও ক্রয়ক্ষমতা গভীরভাবে বুঝতে হবে। শুধু ভালো পণ্য বাজারে নিয়ে আসাই যথেষ্ট নয়; সেই পণ্য কীভাবে গ্রাহকের দৈনন্দিন জীবনে মূল্য সংযোজন করছে, সেটিও কার্যকরভাবে তুলে ধরা জরুরি। দ্বিতীয়ত, ব্র্যান্ডের একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে অনেক ব্র্যান্ড একই ধরনের বৈশিষ্ট্য ও সুবিধা তুলে ধরে। এ অবস্থায় একটি ব্র্যান্ড কী কারণে অন্যদের থেকে আলাদা, গ্রাহকের কাছে তার বিশেষ মূল্য কী এবং কেন গ্রাহক সেই ব্র্যান্ডকে বেছে নেবেন—এই বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সৃজনশীল মার্কেটিং, ডিজিটাল যোগাযোগ, কার্যকর ক্যাম্পেইন এবং গ্রাহকের সঙ্গে নিয়মিত সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তৃতীয়ত, গ্রাহকের আস্থা অর্জন করতে হবে। একটি ব্র্যান্ডের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য শুধু বিজ্ঞাপন বা প্রচারণার ওপর নির্ভর করে না; পণ্যের মান, বিক্রয়-পরবর্তী সেবা, গ্রাহকের অভিযোগের কার্যকর সমাধান এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার ওপরও নির্ভর করে। গ্রাহকের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হলে সেই সম্পর্ক ব্র্যান্ডের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
প্রশ্ন: ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কনটেন্ট মার্কেটিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ইফতেখার উদ্দিন সানী: বর্তমান সময়ে ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কনটেন্ট মার্কেটিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে স্মার্টফোন শিল্পে গ্রাহকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি, নতুন পণ্যের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা এবং ব্র্যান্ডের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যমের কার্যকারিতা অনেক বেশি। বর্তমানে গ্রাহকেরা কোনো স্মার্টফোন কেনার আগে অনলাইনে এর ফিচার, রিভিউ, ভিডিও, তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং অন্যান্য ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চান। ফলে একটি ব্র্যান্ডের জন্য শুধু প্রচারণা চালানোই যথেষ্ট নয়; বরং গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক, আকর্ষণীয় ও বিশ্বাসযোগ্য কনটেন্ট তৈরি করাও জরুরি। কনটেন্টের মাধ্যমে পণ্যের প্রযুক্তিগত সুবিধাগুলো সহজভাবে উপস্থাপন করা গেলে গ্রাহক পণ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা পান। তবে আমার মতে, ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের সাফল্য শুধু ভিউ, লাইক কিংবা ফলোয়ারের সংখ্যার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। একটি ক্যাম্পেইন গ্রাহকের মধ্যে কতটা আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে, ব্র্যান্ড সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা গড়ে তুলেছে কি না এবং ব্যবসায়িক লক্ষ্য অর্জনে কতটা ভূমিকা রেখেছে—সেগুলোও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম স্মার্টফোন ব্র্যান্ডগুলোর কাছে কী প্রত্যাশা করে বলে আপনি মনে করেন?
ইফতেখার উদ্দিন সানী: বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম স্মার্টফোন ব্র্যান্ডগুলোর কাছে শুধু একটি ডিভাইস প্রত্যাশা করে না; তারা এমন একটি প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা চায়, যা তাদের দৈনন্দিন জীবন, সৃজনশীলতা, বিনোদন, পড়াশোনা ও পেশাগত কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তরুণদের কাছে স্মার্টফোন এখন যোগাযোগের মাধ্যমের পাশাপাশি নিজেদের দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব ও সৃজনশীলতা প্রকাশেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বর্তমান প্রজন্মের কাছে ক্যামেরার মান, দ্রুত পারফরম্যান্স, দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারি, আকর্ষণীয় ডিজাইন, গেমিং অভিজ্ঞতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে যারা কনটেন্ট তৈরি করেন, অনলাইন গেম খেলেন কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়, তাঁদের কাছে স্মার্টফোনের সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তরুণরা চান, তাঁদের বাজেটের মধ্যে সর্বোচ্চ সুবিধা ও ভালো মানের পণ্য নিশ্চিত হোক।
প্রশ্ন: যারা ভবিষ্যতে ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, মার্কেটিং কিংবা টেলিকম খাতে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাঁদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
ইফতেখার উদ্দিন সানী: যারা ভবিষ্যতে ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, মার্কেটিং কিংবা টেলিকম খাতে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাঁদের জন্য আমার পরামর্শ হলো—শুধু ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এই খাতগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই এখানে সফল হতে হলে শেখার আগ্রহ, সৃজনশীলতা এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
প্রশ্ন: আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের স্মার্টফোন বাজার ও ব্র্যান্ড মার্কেটিংয়ের ভবিষ্যৎ আপনি কীভাবে দেখছেন?
ইফতেখার উদ্দিন সানী: আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের স্মার্টফোন বাজার ও ব্র্যান্ড মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে বলে আমি মনে করি। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি, ভোক্তাদের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা এবং ডিজিটাল জীবনযাত্রার বিস্তারের ফলে এই বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও আরও কৌশলনির্ভর হয়ে উঠবে। সবশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের স্মার্টফোন বাজারের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময়, তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে শুধু পণ্য বিক্রির চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে গ্রাহকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কারণ প্রযুক্তি একটি ব্র্যান্ডকে পরিচিত করতে পারে, কিন্তু গ্রাহকের আস্থা, ইতিবাচক অভিজ্ঞতা এবং ধারাবাহিক মূল্য সংযোজনই সেই ব্র্যান্ডকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।